1. mirzaromeohridoy@gmail.com : Kazi Sakib : Kazi Sakib
  2. hridoysmedia@gmail.com : news :
বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ০৮:২৫ পূর্বাহ্ন

আজ ৯ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক কপিলমুনি হানাদার মুক্ত দিবস

  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৭৯ বার পড়া হয়েছে
রায়সাহেবের এই বাড়ীটি ঘিরে ছিল কপিলমুনি রাজাকার ঘাঁটি।

প্রবীর জয়, কপিলমুনি : আজকের দিনে রাজাকারদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর রাজাকারদের আত্নসমর্পণ ও কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দিরের মাঠে জনতার দাবির মুখে ১৫৬ জন যুদ্ধাপরাধীদের গুলি করে হত্যা করা হয়। আর এর মধ্য দিয়েই পতন হয়, দক্ষিণ খুলনার অন্যতম প্রধান রাজাকার ঘাঁটির। যুদ্ধকালীণ সময়ে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কপিলমুনির রায়সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর সুরম্য বাড়িটিকে দখল করে রাজাকাররা সেখানে শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। খুলনাঞ্চলের মধ্যে এই রাজাকার ঘাঁটিটি ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। কয়েক’শ রাজাকার এখান থেকেই আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক তান্ডব চালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একাধিকবার এই ঘাঁটিটি দখল করার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা অভিযান পরিচালনা করেন, কিন্তু ঘাঁটিটির অবস্থানগত সুবিধা, রাজাকারদের কাছে থাকা অস্ত্র সম্ভারের প্রাচুর্য এবং রাজাকার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকায় ও সর্বোপরী এলাকাবাসীর অসহযোগিতায় অভিযানগুলো সফল হয়নি। প্রতিবারের যুদ্ধেই রাজাকাররা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটলে তারা আশপাশের মানুষদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিত, যাতে করে মুক্তিযোদ্ধারা এই অঞ্চলে কোনো গেরিলা সুবিধা পেতে না পারে। তাছাড়া এ অঞ্চলে ব্যাপক সংখ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বসবাস হওয়ায় রাজাকারদের অত্যাচার-নির্যাতনও সীমাহীন পর্যায়ে পৌছায়। প্রথমে হিন্দু ধর্মাবলম্বী, কিছুদিন পর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থকদের ওপর তারা অবর্ণনীয় নির্যাতন করে। কপিলমুনিকে ঘাঁটি করে আশপাশের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে চলত এই নির্মম নির্যাতন। বিভিন্ন গ্রামে হানা দিয়ে লুটপাট, ধর্ষণ, অপহরণ ছিল রাজাকারদের নিত্য কর্ম। এঘাঁটিতে নিয়মিত ২ শ’রও বেশি রাজাকাররা সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে এমন কোন অপকর্ম নেই যে তারা করেনি। কপিলমুনি অঞ্চলে রাজাকারদের তান্ডবের খবর প্রচার হলে মুক্তিযোদ্ধারা এই রাজাকার ঘাঁটিটি দখল করার উদ্যোগ নেন। ডিসেম্বরের আগে কপিলমুনির এই রাজাকার ঘাঁটিতে অন্তত দু’বার আক্রমণের ঘটনা ঘটে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১১ জুলাই আক্রমণে নেতৃত্ব দেন লেফটেন্যান্ট আরেফিন। এই যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন লতিফ, সরদার ফারুক আহমেদ, মনোরঞ্জন, রহমত আলী, মাহাতাপ, দিদার, আবদুর রহিম, আনোয়ারুজ্জামান বাবলু ও জাহান আলী। মুক্তিযোদ্ধারা বাজারের দক্ষিণ দিক থেকে রাজাকার ঘাঁটিতে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। কিন্তু প্রথমত নিরুপায় হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তখন ঘাঁটি ছেড়ে আরো পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে আবার আরো সতর্কতার সাথে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পনা শুরু করে রাজাকার ঘাঁটি আক্রমণে। তাঁরা অতি দ্রুত রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করেন। এতে অংশ নেন ইউনুস আলী ইনু, স ম বাবর আলী, গাজী রহমতউল্লাহ, লেফটেন্যান্ট সামসুল আরেফিন, আবদুস সালাম মোড়ল, সাহিদুর রহমান কুটু, আবুল কালাম আজাদ, শেখ শাহাদাৎ হোসেন বাচ্চু, গাজী রফিকুল ইসলাম, শেখ আবদুল কাইয়ুম প্রমুখ। সিদ্ধান্ত হয়, রাজাকার ঘাঁটির পতন না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী ৪ ডিসেম্বর রাতে মুুুুক্তিযোদ্ধারা তাদের নির্দিষ্ট পজিশনে চলে যান, শুরু হয় আক্রমণ। রাজাকাররাও পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে। রাত শেষ হয়ে ভোর হয়, একটি নতুন দিনের সূচনা। কিন্তু যুদ্ধ থেমে থাকে না। দুই পক্ষেই বেশ গোলাগুলি চলতে থাকে। দিনের আলো বাড়তে থাকে, সূর্যের আলোর তেজের সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণও বাড়তে থাকে। বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়, একসময় দুপুরও পার হয়ে যায়, কিন্তু যুদ্ধ থামে না। রাজাকাররা তিন দিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়লেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দেওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে তাদের প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে থাকে। কৌশলগতভাবে তারা ভালো অবস্থানে এবং মুক্তিযোদ্ধারা খোলা স্থানে থাকলেও মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের আক্রমণ অব্যাহত রাখেন। চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করে চললেও রাজাকাররা প্রথমত দমে যায়নি বরং মাইক্রোফোনে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে বিশ্রী নোংরা ভাষায় গালাগালি করছিল এবং আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাচ্ছিল। এক পর্যায়ে রাজাকাররা প্রস্তাব দেন যে, আমরা বাবর আলীর সাথে আত্মসমর্পণের কৌশল নিয়ে কথা বলতে চাই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা কেউই তাদের এই প্রস্তাবে আস্থা রাখতে পারেনি। এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা ওমর ফারুককে বাবর আলী পরিচয়ে রাজাকারদের সঙ্গে কথা বলতে পাঠানো হয়। রাজাকাররা তাদের নিশ্চিত পশ্চাৎপসারণের সুযোগ দাবি করায় আলোচনা ভেঙে যায়। শুরু হয় আবারও তুমুল লড়াই। এতে করে রাজাকারদের মনোবল ভেঙে পড়ে। রাজাকার শিবির দখল যখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, তখন রাজাকাররা যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকে। এক সময় রাজাকাররা সাদা পতাকা উড়িয়ে আত্নসমর্পন করলে ৯ ডিসেম্বর তাদের গ্রেফতার করা হয়। তবে গ্রেফতার করার পর দেখা যায়, রাজাকারদের অনেকেই রাতের আঁধার ও যুদ্ধের ফাঁকে সরে পড়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আলী ইনুর মতে, ধৃত রাজাকারদের সংখ্যা ছিল ১৭৭। তবে তথ্যানুসন্ধানে আরো জানাযায়,রাজাকারদের ১৫৬ জনকে দড়ি দিয়ে বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে তাদের গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ